চাটিকিয়াং রুমানের ব্লগ

বৃহস্পতিবার, ১৩ অক্টোবর, ২০১১

মনে পড়ে যায় শৈশবের সেই দিনগুলো


সেদিন অনেক দিন পর নানার বাড়িতে গেলামঅনেকদিন পর বলতে প্রায় ৪/৫ মাস পর নাগরিক কিংবা পড়ালেখার ব্যস্ততার কারণে আগের মত তেমন কোথাও বেড়াতে যাওয়া হয়নাহয়ত সেদিনও যাওয়া হতোনানানার বাড়ির পাশে আমার চাচাত বোনের শ্বশুর বাড়িতে মেজবানের দাওয়াত ছিলযার কারণে ঐদিকে যাওয়ার কারনে একসাথে নানুদের দেখে আসা

নানার বাড়িতে ঢুকে নানুর সাথে কুশলাদি বিনিময় করার পর নানু আমাকে জিজ্ঞেস করলো- পড়ালেখার কি অবস্থা? আমি বললাম সামনে পরীক্ষা, দোয়া করিওনানু বললো- পরীক্ষা দিতে দিতে তোর আর বিয়ে করা হবেনাকথাটা শুনে আমার পাশে থাকা ছোট মামা, মামি আর পিচ্ছি কাজিনরা খুব করে হাসলামতখন নানুকে বললাম- গ্রাজুয়েশন শেষ হতে আর বেশি দিন নেই, তখন তোমরা না হয় তোমাদের নাতিনকে নিয়ে এসো 

নানার বাড়ির পাশেই রয়েছে সুন্দর একটা পুকুরশৈশবে যখন নানার বাড়িতে যেতাম তখন কাজিনরা মিলে পুকুরে লাফালাফি করে গোসল করার স্বাদ মিঠাতাম, পানিতে লাফালাফি করার কারণে চোখ যখন লাল হয়ে যেত তখন পুকুরে দুষ্টুমির পর্ব শেষ হত বিশেষ করে যখন বিদ্যালয়ের বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হত তখন কয়েক দিনের জন্য নানার বাড়িতে গিয়ে থাকা হতকারণ ঐ সময়ে সব কাজিনরা নানার বাড়িতে কয়েকদিনের জন্য যেতামযাওয়ার সাথে সাথে শুরু হত আমাদের দস্যি-পনানাস্তা করেই কাজিনদের সাথে বের হয়ে পড়তাম দৌড়াদৌড়িতেনানার বাড়ির পাশেই বিল থাকার কারণে বিলের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছুটে বেড়াতামবিলের পাশেই রয়েছে খালসেই খালে সাতার কাটতামশীতের মৌসুমে বিলে ক্রিকেট-ফুটবল খেলতামসারাদিনের এই দস্যি-পনা শেষে রাতে যখন ঘুমাতে যেতাম তখন শুরু হত অন্যান্য কাজিনদের জ্বীন-ভূতের ভয় লাগানোর পালা কাজিনদের মনে জ্বীন-ভূতের ভয় ঢুকিয়ে দেয়ার কারণে পরেরদিন সকালে মা'র বকা শুনতে হত কারণ মা'র কাছে কাজিনদের কর্তৃক আমার বিরুদ্ধে নালিশ যেত যে আমি কাজিনদের মনে জ্বীন-ভূতের ভয়-ভীতির সঞ্চার করেছি

কিন্তু নানার বাড়ির আগের সেই জৌলুস এখন আর নেইকারণ সময়ের পরিক্রমায় সব কিছু যেন পাল্টে গেছেনানু ভাইয়াও মারা গিয়েছে আজ প্রায় ৩ বছর হলো আগের মত যাওয়া হয়না নানার বাড়িতেতাছাড়া দিন দিন বয়সটা বাড়ছেআগের সেই বয়স আর নেই যে মন চাইলেই শৈশবের মত ছুটাছুটি করবো

সেদিন যখন নানার বাড়িতে গেলাম তখন কেন জানি শৈশবের কথা খুব করে মনে পড়ে গেল যে পুকুরে গোসল করার সময় অসম্ভব দুষ্টুমি করতাম সেই পুকুর ঘাটে বেশ কিছু সময় বসে ছিলামকেন জানি নানার বাড়ির পুকুরটা আমার বেশ ভাল লাগেপুকুরের চারিদিকে গাছ, চমৎকার মৃদু হাওয়াদেখলাম ছোট ছোট মাছ আপন খুশিতে চষে বেড়াচ্ছে দল-বল নিয়ে

নানার বাড়িতে যাওয়ার আগে একই দিন সকালে নানুকে ফোন করেছিলাম যে আমরা ঐদিকে যাবতাই নানুকে অনুরোধ করলাম- কয়েকদিনের জন্য আমাদের বাড়িতে যেন বেড়াতে আসেচাচাত বোনের শ্বশুর বাড়ি থেকে মেজবানের দাওয়াত খেয়ে আসার পথে নানার বাড়ি থেকে বেড়িয়ে সাথে করে নানুকে নিয়ে এসেছিলাম আমাদের বাড়িতে

মঙ্গলবার, ৪ অক্টোবর, ২০১১

মায়া সভ্যতা



১০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের দিকে মধ্য আমেরিকার নিম্নভূমির বনাঞ্চলে এক অদ্ভুত সভ্যতার বিকাশ ঘটেছিল। “মায়া” নামে এই সভ্যতা যে জনগোষ্ঠী নির্মাণ করেছিল, তারা অধিকাংশ প্রাথমিক সভ্যতা নির্মাণকারীদের মতো শহরে জীবন যাপন করত না। বরং তাদের বসবাস ছিল ছোট ছোট কৃষি-গ্রামে। তারা পিরামিডের মতো দেখতে উপাসনাগৃহ ও উৎসবস্থল তৈরি করেছিল। এগুলো ছিল তাদের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক জীবনের কেন্দ্রবিন্দু। মায়াদের ৪টি প্রধান কেন্দ্র ও অনেকগুলো ছোট ছোট কেন্দ্র ছিল। প্রধান কেন্দ্রগুলোর একেকটি থেকে দেশের প্রায় এক চতুর্থাংশ এলাকায় শাসনকার্য চালানো হত।


মায়াদের তৈরিকৃত একটি উপাসনাগৃহ

মায়া সভ্যতায় চিত্র-লিখন পদ্ধতি ও নির্ভুল পঞ্জিকা ব্যবস্থা চালু ছিল। তাদের জ্যোতির্বিদরা সূর্যগ্রহনের দিন তারিখ সম্পর্কে ভবিষ্যৎ বানী করতে পারত। মায়া শিল্পীরা পাথর খোদাই শিল্পে ছিল অতুলনীয়।


মায়া সভ্যতার পঞ্জিকা

কিন্তু ৯০০ খ্রিস্টাব্দের দিকে মায়ারা তাদের সভ্যতার কেন্দ্রগুলো ছেড়ে চলে যায় এবং তাদের স্থিতিশীল জীবনব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়ে। ১৫ শতকে স্পেনীয়রা যখন ওই এলাকায় আসে তখন নিজেদের মধ্যে লড়াই করতে করতে নিঃশেষ প্রায় মায়া জনগোষ্ঠীর কাছ থেকে তাদের খুব বেশি প্রতিরোধের সম্মুখীন হতে হয়নি।


মায়া সভ্যতার একটি প্রাচীন নিদর্শন

অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে যে, সেই মায়া সভ্যতার বর্তমান অবস্থান কোথায়? বর্তমানে মায়া সভ্যতার অবস্থান হচ্ছে- মেক্সিকোর দক্ষিণাঞ্চল, গুয়াতেমালা, বেলিজ, এল সালভেদরের উত্তরাঞ্চল এবং হন্ডুরাসের পশ্চিমাঞ্চলে।


প্রাচীন মায়া সভ্যতার বর্তমান মানচিত্র



বৃহস্পতিবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০১১

মধ্যযুগের বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য

বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের পতাকা


বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য সম্পর্কে কিছু জানার আগে সম্রাট কনস্ট্যানটাইন সম্বন্ধেও কিছু জানা দরকার। আর এই সম্রাট কনস্ট্যানটাইন ছিলেন পশ্চিম রোম সম্রাট প্রথম কনস্ট্যানটিয়াসের পুত্র। ব্রিটেন সফরে গিয়ে কনস্ট্যানটিয়াস মারা গেলে সৈন্যরা তাৎক্ষণিকভাবে সেখানে কনস্ট্যানটাইনকে সম্রাট হিসেবে ঘোষণা করে। তিনি ৬ বছর ব্রিটেন ও গল শাসন করেন। অন্যদিকে সিংহাসনের আরেক দাবিদার ম্যাক্সেনটিয়াস শাসন করেন রোম।

৩১২ সালে মিলভিয়ান সেতুর যুদ্ধে ম্যাক্সেনটিয়াসকে পরাজিত ও নিহত করেন কনস্ট্যানটাইন। যুদ্ধ শুরুর ঠিক আগ মুহূর্তে তিনি আকাশে মেঘের গায়ে ক্রুশ চিহ্ন দেখতে পান এবং ঘটনাটি তাকে খ্রিস্ট ধর্মে দীক্ষিত হতে অনুপ্রাণিত করে। তিনি এর পরই ধর্মীয় সহনশীলতার নীতি প্রবর্তন করেন এবং খ্রিস্ট ধর্মালম্বীদের উপর নির্যাতন বন্ধের ব্যবস্থা করেন। ৩২৪ সালে পূর্ব রোম সাম্রাজ্যের সম্রাট লিসিনিয়াসকে পরাজিত করে পুরো সাম্রাজ্যের অধীশ্বর হন। এর এক বছর পর তিনিই প্রথম নাইসিয়ায় (বর্তমান তুরস্কের ইনজির) খ্রিস্টান গির্জাসমূহের সম্মেলন আহবান করেন।



সম্রাট কনস্ট্যানটাইন



কনস্ট্যানটাইন ৩৩০ সালে সাম্রাজ্যের রাজধানী পৌত্তলিক রোম থেকে সরিয়ে নতুন শহর কনস্ট্যান্টিনোপলে নিয়ে যান। শহরটি বাইজেন্টিয়ামের (বর্তমান তুরস্কের রাজধানী ইস্তাম্বুল) গ্রাম এলাকায় তৈরি হয়েছিল।

কনস্ট্যানটাইন যখন ৩৩০ সালে রোমান সাম্রাজ্যের রাজধানী রোম থেকে তার নতুন শহর কনস্ট্যান্টিনোপলে স্থানন্তর করেন তখন তিনি শুধু ক্ষমতার কেন্দ্রেরই পরিবর্তন ঘটাননি, ৪৭৬ সালে রোমের পতনের পরও রোমান সাম্রাজ্য অব্যাহত বা টিকিয়ে রাখার পথ দেখান। কনস্ট্যান্টিনোপলের অবস্থান ছিল প্রাচীন গ্রিক বাইজেন্টিয়ামের পাশে। ঐতিহাসিকরা প্রায়ই পূর্ব রোমান সাম্রাজ্যকে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য হিসেবে অভিহিত করেন। ৫২৭ থেকে ৫৬৫ সালের মধ্যে প্রথম জাস্টিনিয়ানের শাসনকালে এই সাম্রাজ্য বহুদূর পর্যন্ত বিস্তার লাভ করেছিল। তার শক্তিমান জেনারেল নার্সেস ও বেলিসারিয়াস এই সাম্রাজ্যের বিস্তার ঘটান এশিয়া মাইনর, বলকান উপদ্বীপ, ফিলিস্তিন, মিশর, উত্তর আফ্রিকা, স্পেনের দক্ষিণাঞ্চল এবং ইতালির অংশবিশেষ পর্যন্ত। জাস্টিনিয়ানের মৃত্যুর কয়েক বছর পর বাইজেন্টাইন ক্রমশ সংকুচিত হয়ে আসে।




বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের মানচিত্র


বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যে খ্রিস্ট ধর্মের নিজস্ব বৈশিস্ট্য ছিল, যার রক্ষণকর্তা ছিল ইস্টার্ন অর্থডক্স চার্চ। জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্প সংস্কৃতিরও উন্নত কেন্দ্র ছিল এই সাম্রাজ্য। এরই প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছিল দক্ষিণ ইউরোপে। ১৪৫৩ খ্রিস্টাব্দে তুর্কিরা এই সাম্রাজ্যের পতন ঘটায়। এবং এরই সাথে সাথে সমাপ্তি ঘটে মধ্যযুগের।

১৩০০ সালের দিকে ওসমান নামের এক তুর্কি নেতা কৃষ্ণ সাগরের উপকূলে এশিয়া মাইনরে একটি রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। তার অনুসারী এবং উত্তরাধিকারীরা অটোমান বা উসমানিয়া হিসাবে পরিচিত। তারা ক্রমশ এশিয়া মাইনরে রাজ্য বিস্তার করতে থাকে এবং ১৩৪৫ সালে তারা বাইজেন্টাইন সম্রাট জন ক্যানটাকুজেনকে সাহায্য করতে এশিয়া পেরিয়ে ইউরোপে যায়। সে সময় গৃহযুদ্ধ চলছিল।




সে সময়কার মুদ্রা


ইউরোপে পা রেখেই অটোমান বা উসমানিয়া তুর্কিরা দ্রুত তাদের অবস্থান সুদৃঢ় করতে থাকে। ১৪০০ সাল নাগাদ কয়েকটা অভিযানের পর তারা ম্যাসিডোনিয়া, সার্বিয়া এবং বুলগেরিয়া জয় করে। তারা বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যকে সংকুচিত করতে করতে বাইজেন্টিয়ামের (কনস্ট্যান্টিনোপল) চৌহদ্দিতে নিয়ে আসে। তখন এর আয়তন ছিল আজকের তুরস্কের আয়তনের সমান।
 

বাইজেন্টিয়ামকে কিছুকালের জন্য রক্ষা করেন মোঙ্গল বীর তৈমুর লং। তিনি ছিলেন চেঙ্গিস খানের বংশধর। ১৪০২ সালে তিনি অধিকাংশ উসমানিয়া সাম্রাজ্য তছনছ করে দেন। এমনকি তার মৃত্যুর পরও উসমানিয়া সাম্রাজ্যে গৃহযুদ্ধ চলতে থাকে। কিন্তু ১৪৫১ সালে দুর্দান্ত ও অদম্য সুলতান মোহাম্মদ ফতেহ বিজয়ীর বেশে আবির্ভুত হন এবং উসমানিয়া সাম্রাজের সিংহাসনে আরোহন করেন। ১৪৫৩ সালে দেড় লাখ সৈন্য নিয়ে তিনি কনস্ট্যান্টিনোপল অবরোধ করেন।

তার এক বিশাল গোলন্দাজ বাহিনী ৬ সপ্তাহ ধরে নগরীটিতে গোলাবর্ষণ করতে থাকে এবং তিনদিক থেকে স্থলভাগে তুর্কিবাহিনী এবং নৌপথে তুর্কি জাহাজ আক্রমণ চালায়। সর্বশেষ বাইজেন্টাইন সম্রাট একাদশ কনস্ট্যান্টাইনের সৈন্যসংখ্যা ছিল ৮ হাজার। তা সত্ত্বেও তারা দুর্ভেদ্য প্রতিরোধ গড়ে তোলে এবং তুর্কিরা চূড়ান্তভাবে হামলে পড়বার আগে ৫৪ দিন পর্যন্ত তাদের প্রতিরোধ করতে সক্ষম হয়। ইতিমধ্যে সম্রাট কনস্ট্যান্টাইন নিহত হন। অতঃপর তুর্কিরা নগরীটিকে জয় করে তাদের সাম্রাজ্যের রাজধানী হিসাবে গড়ে তুলতে থাকে এবং তারা এই নগরীর নাম দেয় ইস্তাম্বুল।



 

কালের সাক্ষী হয়ে এখনো দাঁড়িয়ে আছে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের সীমানা প্রাচীর


কনস্টানন্টিনোপলের পতনকে গণনা করা হয় মধ্যযুগের অবসান হিসাবে। কনস্টানন্টিনোপলের অনেক পন্ডিত পশ্চিমে পালিয়ে যান, তারা শিক্ষা বিস্তারে উৎসাহ জোগান এবং উচ্চতর জ্ঞানচর্চা করেন, যা রেনেসাঁস বলে পরিচিত।


বর্তমানে যে সমস্ত দেশ সমূহ সে সময়ে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের অন্তর্ভূক্ত ছিল সেগুলো হলো- আলবেনিয়া, আলজেরিয়া, আর্মেনিয়া, বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা, বুলগেরিয়া, ক্রোয়েশিয়া, সাইপ্রাস, মিশর, ফ্রান্স, জর্জিয়া, গ্রিস, সিরিয়া, ইরান, লিবিয়া, লেবানন, ফিলিস্তিন, ইসরাইল, ইটালি, জর্ডান, কসোভো, মেসিডোনিয়া, মাল্টা, মন্টেনিগ্রো, মরক্কো, পর্তুগাল, রোমানিয়া, স্যান মারিনো, সার্বিয়া, স্লোভেনিয়া, স্পেন, তিউনিশিয়া, তুরস্ক, ইউক্রেন এবং ভ্যাটিকান সিটি।


ফে ফ্রাংকলিন সম্পাদিত হিস্ট্রিজ টাইমলাইন অবলম্বনে।

সোমবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০১১

ঘুরে এলাম শ্রীহট্ট থেকে- শেষ পর্ব


মঙ্গলবার; ১৫.০৩.২০১১ইং।

সকাল পৌনে ৮টায় রেষ্টুরেন্ট থেকে প্রাতঃরাশ সেড়ে রাস্তার পাশে দাড়ালাম। এদিকে লাকী ভাই জাফলং যাওয়া-আসার উদ্দেশ্যে আমাদের জন্য সিএনজি ভাড়া করছে। ১০মিনিট পর তিনি আমাদের জানালেন ১০০০ টাকার কমে সিএনজি যেতে রাজি হচ্ছেনা। ভাইয়া উনাকে আরো ২/১টা সিএনজি দেখতে বললেন এর চেয়ে কম দামে যায় কিনা দেখার জন্য। এর কিছুক্ষণ তিনি বললেন, সিএনজি ঠিক করা হয়েছে, ভাড়া ৯০০টাকা। তারপর আমরা উঠে পরলাম নির্ধারিত সিএনজি’তে। ঠিক ৮টায় রওনা দিলাম জাফলং সহ আরো কয়েকটি পর্যটন স্থানের উদ্দেশ্যে।






সিএনজি ছুটে চলছে সামনের দিকে। আর আমরা অবলোকন করছি আশ-পাশের প্রাকৃতিক দৃশ্য। হঠাৎ টেক্সি ডানে মোড় নিল। মেইন সড়ক থেকে প্রায় ২০গজ ভিতরে ঢুকে টেক্সি থামিয়ে চালক বললেন এটা হল- জৈন্তাপুরের জৈন্তা রাজপ্রাসাদ। ততক্ষণে আমরা সিলেট শহর থেকে ৪৩ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে এসেছি। এই জৈন্তাপুর প্রাচীন রাজার রাজধানী নামে খ্যাত। ১৮ শতকে জৈন্তা রাজার রাজধানী ছিল এই জৈন্তাপুর। এটি জৈন্তাপুর বাজারের কাছে। ঘুরে ফিরে দেখলাম জৈন্তা রাজপ্রাসাদ। বর্তমানে ধ্বংশ প্রায় এই রাজপ্রাসাদটি দেখতে অনেক পর্যটক আসে। রাজপ্রাসাদ এলাকার মাঝে একটা কূপ দেখলাম। পরে টেক্সি চালকের মাধ্যমে জানতে পারলাম এটা আসলে কূপ নয়। সে সময়ে মৃত্যুদন্ড হিসেবে রাজার আদেশে শিরচ্ছেদ করে শাস্তিপ্রাপ্ত ব্যক্তির মাথা এই কূপের মধ্যে ফেলে দেয়া হত।



এই সেই কুখ্যাত কূপ


রাজপ্রাসাদের ধ্বংসাবশেষ


রাজপ্রাসাদটি দেখে আমরা রওনা দিলাম জাফলং-এর উদ্দেশ্যে। জৈন্তাপুর থেকে জাফলং যাওয়ার পথে দূরে উচু উচু পাহাড় চোখে পড়ল। ঘড়িতে সময় যখন প্রায় ১০টার কাছাকাছি তখন আমরা পৌঁছে গেলাম জাফলং-এ। সেখানে পৌঁছে একটা মোটামুটি মানের খাবারের হোটেল থেকে নাস্তা সেড়ে বেরিয়ে পড়লাম জাফলং-এর সৌন্দর্য্য উপভোগ করার জন্য। একটা কথা উল্লেখ্য যে জাফলং পিয়াং নদীর তীরে অবস্থিত। সারিবদ্ধ বেশ কয়েকটা দোকান দেখতে পেলাম পিয়াং নদীর তীরে যেখানে রয়েছে- মনিপুরী, ত্রিপুরী, খাসিয়া সহ আরো বেশকয়েকটি নৃ-তাত্ত্বিক গোষ্ঠী কর্তৃক তৈরী করা কাপড়ের দোকান, পাথর খোদাইয়ের দোকান, আরো রয়েছে পাঠা তৈরীর দোকান সহ কসমেটিক্সের দোকান। নৃ-তাত্ত্বিক গোষ্ঠীদের তৈরী করা কাপড়ের চাহিদা রয়েছে বেশ। একেকটি শাড়ির দাম ৫০০ টাকা থেকে ১৫০০ টাকা। শাড়ি ছাড়া রয়েছে- বেডসিট, শাল, মেয়েদের ওড়না, সালোয়ার কামিজ।








বিভিন্ন দোকানের পসরা


পিয়াং নদী থেকে পাথর তোলা শিল্প দেখলাম হেঁটে হেঁটে। জাফলং-এর অন্যতম আকর্ষণ “জাফলং জিরো পয়েন্ট”। সেখানে যাওয়া-আসার জন্য ৪০০টাকা দিয়ে একটা ইঞ্জিন চালিত বোট ভাড়া করলাম। মাত্র ২০ মিনিটের মধ্যেই পৌঁছে গেলাম জিরো পয়েন্টে। যেখানে একপ্রান্তে বিডিআর’এর চৌকি অন্যপ্রান্তে বিএসএফ’এর চৌকি। একপাশে ভারতের খাসিয়ারা পিয়াং নদীতে গোসল সাড়ছে এবং মাছ শিকার করছে আর অন্যপাশে একই নদীতে বাংলাদেশী পর্যটকরা আনন্দ সহকারে গোসল করছে। শুধু মাঝখানে একটা সীমান্ত রেখা। নদীর পানি কিন্তু খুবই ঠান্ডা এবং স্বচ্ছ। এদিকে বিডিআর ও বিএসএফের সদস্যরা বাংলাদেশী পর্যটক ও ভারতীয় খাসিয়াদের প্রতি দৃষ্টি রাখছে যাতে তারা ভুলকরে সীমান্ত অতিক্রম না করে।





জাফলং জিরো পয়েন্টে


ঘন্টা খানেকের মত জিরো পয়েন্টে থাকার পর আবারো বোটে করে রওনা দিলাম জাফলং-এর প্রধান কেন্দ্রে। ২০ মিনিটের মধ্যেই চলে আসলাম জাফলং-এর প্রধাণ কেন্দ্রে। জিরো পয়েন্টে যাওয়া-আসার পথে পিয়াং নদী থেকে শ্রমিকদের কর্তৃক পাথর তোলার দৃশ্য সত্যিই চমৎকার। বোট থেকে নেমে শখের বশে নদীর তীর থেকে কয়েকটা পাথরও সঙ্গে নিলাম। এরপর উপোরেল্লিখ দোকান থেকে কিছু কেনাকাটা করলাম। আরো কিছুক্ষণ ঘোরাফেরা করার পর জাফলংকে বিদায় জানিয়ে টেক্সি করে আমরা রওনা দিলাম সিলেটের উদ্দেশ্যে।






জাফলং থেকে সিলেটে ফেরার পথেই পড়বে তামাবিল স্থলবন্দর। জাফলং থেকে তামাবিল স্থলবন্দরের দূরত্ব মাত্র আড়াই কিলোমিটার। ভারত থেকে বাংলাদেশে কয়লা আসে এই স্থলবন্দর দিয়ে। তামাবিলের ওপারে হচ্ছে ভারতের শিলং অঞ্চল। তামাবিল সীমান্তের পাশেই রয়েছে ৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের একটা সমাধিস্থান।



তামাবিল সীমান্তে মুক্তিযোদ্ধাদের সমাধিস্থান


তামাবিল জিরো পয়েন্ট


তামাবিল থেকে রওনা হলাম-শ্রীপুরের উদ্দেশ্যে। শ্রীপুর হচ্ছে একটা পর্যটন স্থান। জাফলং এবং তামাবিল ভ্রমণের পর সিলেটে ফেরার পথে শ্রীপুর ভ্রমণ করতে পারেন। জাফলং থেকে এর দূরত্ব ৮ কিলোমিটার। সুন্দর সুন্দর গাছ এবং একটি লেক রয়েছে সেখানে। কিন্তু ঐ লেকটি পানি শুন্য! সুন্দর সময় কাঁটানোর একটা আদর্শ স্থান হতে পারে শ্রীপুর পর্যটন স্থানটি।








এসব কিছু দেখে রওনা হলাম সিলেটের উদ্দেশ্যে। সিলেট শহরে পৌঁছতে পৌঁছতে বিকেল প্রায় পৌনে ৪টা। এরপর “পাঁচ ভাই রেষ্টুরেন্ট” থেকে দুপুরের খাবার সেড়ে ফিরলাম হোটেলে।


এরপর সন্ধ্যা ৬টার দিকে সবাইকে নিয়ে বের হলাম সিলেট শহরে ঘুরার জন্য। সিলেট শহরে ঘুরতে ফিরতে কয়েকটা উপহার সামগ্রী কিনলাম। রাত সোয়া ৮টার দিকে হোটেলে ফিরে আসলাম। হোটেলে ফিরে সবার সাথে আড্ডা দিয়ে অলস সময় কাটাতে লাগলাম। এর ঘন্টাখানেক পর খাবারের হোটেল থেকে আনা রাতের খাবার হোটেল রুমেই সেড়ে পরের দিন সকালে চট্টগ্রাম ফেরার প্রস্তুতি স্বরূপ সবকিছু গুছিয়ে নিলাম।


পরেরদিন অর্থাৎ ১৬ তারিখে সকালে ঘুম থেকে উঠে সবকিছু সেড়ে সিলেট রেলওয়ে ষ্টেশনের দিকে রওনা হলাম। ষ্টেশনে পৌঁছে লাকী ভাই আর রাসেল ভাইদের সাথে গল্প করে ট্রেন ছাড়ার আগের সময়গুলো কাটিয়ে দিলাম। যখন ট্রেন ছাড়ার সময় হল তখন তাদের (লাকী ভাই আর রাসেল ভাই) কাছ থেকে বিদায় নিয়ে নিলাম। ঘড়িতে সময় যখন ১০:২০ মিনিট তখন ট্রেন সিলেট ষ্টেশন ছেড়ে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা দিল।


রাত যখন পৌনে ৯টা ট্রেন তখন চট্টগ্রাম ষ্টেশনে এসে পৌঁছল। অতঃপর আমার শ্রীহট্ট তথা সিলেট ভ্রমণের সমাপ্তি ঘটল।




বৃহস্পতিবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০১১

ঘুরে এলাম শ্রীহট্ট থেকে-২


১৪.০৩.২০১১ইং; সোমবার।


সকাল সোয়া ৫টায় মোবাইল ফোনের এলার্মের কল্যাণে ঘুম ভাংলো। ঘুম থেকে উঠে সারাদিনের প্রস্তুতি স্বরূন গোসল সেড়ে নিলাম একেবারে। গোসল সাড়ার পর ভাইয়ার বন্ধু লাকী ভাইকে ঘুম থেকে জাগিয়ে তুললাম। তিনিও ফ্রেশ হয়ে নিলেন। এদিকে হোটেল রুমের দরজায় ভাইয়া নক করতে দরজা খুলে দিলাম। ইতোমধ্যে তিনিও প্রস্তুত হয়ে গেলেন। উনাকে রুমে বসিয়ে আমি আর ভাগ্নে প্রস্তুত হয়ে গেলাম।

Share it button

সমতল Copyright © 2011 | Template created by O Pregador | Powered by Blogger